গ্রামের ঘর থেকে বৈশ্বিক বাজারের পথে: রত্নার নতুন যাত্রা

নিজের দক্ষতা ও উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের বৈশ্বিক উইগ (কৃত্রিম চুল) বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছেন রত্না মজুমদার।

July 23, 2026
Group of women in colorful traditional attire bowing to small brown puppies on a red patterned carpet.

বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে রত্না মজুমদারের বাড়িভিত্তিক উদ্যোগে প্রশিক্ষণ পাওয়া নারীরা উইগ ক্যাপ (কৃত্রিম চুল) তৈরি করছেন। ‘স্বপ্ন-২’ প্রকল্পের সহায়তায় তাঁরা ঘরে বসেই আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। তাঁদের দক্ষতা এখন পৌঁছে যাচ্ছে বৃহত্তর বাজারে।

©UNDP Bangladesh

রত্না মজুমদার যখন প্রথম উইগ ক্যাপ (কৃত্রিম চুল) তৈরির কাজ শিখেছিলেন, তখন তিনি ভাবেননি এই দক্ষতাই একদিন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। তখন তাঁর নিজের এলাকায় এই কাজের কোনো বাজারই ছিল না। 

সুন্দরবন ও মোংলা বন্দর শহরের কাছাকাছি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জের এই গ্রামীণ এলাকায় তিনি খুঁজে নেন নতুন এক পথ। আজ নিজের ঘর থেকেই পরিচালনা করছেন উইগ ক্যাপ (কৃত্রিম চুল) তৈরির উদ্যোগ। আজ তাঁর এই উদ্যোগ শুধু তাঁর নিজের আয়ের পথ নয়, এলাকার আরও ১৫ জন নারীর জন্যও তৈরি করেছে নতুন সুযোগ।

তিন বছর আগে রত্নার জীবনে আসে নতুন এক সুযোগ। একটি কারখানায় কাজ করার সুযোগ পেয়ে তিনি সেখানে উইগ ক্যাপ (কৃত্রিম চুল) তৈরির বিশেষ দক্ষতা শেখেন। ধীরে ধীরে এই কাজে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। কিছুদিন সেই কারখানাতেই কাজ চালিয়ে যান। কিন্তু বাড়ি থেকে কারখানার দূরত্ব বেশি হওয়ায় দীর্ঘদিন সেই কাজ চালিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তখন সংসার চালাতে তাঁকে আবার বিভিন্ন অনিয়মিত ও অস্থায়ী কাজের ওপর নির্ভর করতে হয়।

পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয় যখন তিনি ‘স্বপ্ন-২’ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি নিয়মিত আয়ের সুযোগ পান এবং ধীরে ধীরে সঞ্চয় করতে শুরু করেন। পাশাপাশি উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ তাঁকে নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু করার আত্মবিশ্বাস দেয়।

প্রশিক্ষণের পর ৪০ হাজার টাকা (প্রায় ৩২৪ মার্কিন ডলার) প্রারম্ভিক সহায়তা পেয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এবার নিজের উদ্যোগ শুরু করবেন।

তবে শুরুতেই সামনে আসে বড় একটি চ্যালেঞ্জ। মোড়েলগঞ্জের মতো একটি গ্রামীণ এলাকায় উইগ ক্যাপের ক্রেতা কোথায় পাওয়া যাবে?

তাঁর এলাকার বাজারে এই পণ্যের তেমন চাহিদা ছিল না। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। তিনি গ্রামের বাইরের বাজারের কথা ভাবলেন। মোংলায় থাকা চীনের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ব্যবস্থা করেন এবং নিজের বাড়িতেই শুরু করেন উইগ ক্যাপ (কৃত্রিম চুল) তৈরি।

এভাবেই একটি গ্রামীণ বাড়ির ছোট্ট উদ্যোগ ধীরে ধীরে যুক্ত হয় বৃহত্তর উইগ সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে।

নিজের দক্ষতাকে শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। এলাকার আরও নারীদের তিনি এই কাজ শেখাতে শুরু করেন। সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি যাতে তাঁরা আয় করতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি হয় তাঁদের জন্য।

বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে নিজের বাড়িতে উইগ ক্যাপ (কৃত্রিম চুল) তৈরি করছেন রত্না মজুমদার।

©UNDP Bangladesh

বর্তমানে তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন তাঁর এলাকার ১৫ জন নারী। তাঁর বাড়িভিত্তিক এই উদ্যোগ এখন নারীদের কর্মসংস্থানের একটি ছোট কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। তিনি নিজেই কাঁচামাল সংগ্রহ করেন, উৎপাদনের কাজ সমন্বয় করেন এবং তৈরি পণ্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেন।

একসময় নিজের জীবনের অনিশ্চয়তা কাটানোর জন্য যে দক্ষতাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, সেই দক্ষতাই এখন তাঁর নিজের এবং আরও অনেক নারীর আয়ের পথ তৈরি করেছে।

রত্নার গল্প দেখায়, গ্রামীণ উদ্যোক্তা মানেই শুধু প্রচলিত কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নয়। সঠিক দক্ষতা, আর্থিক সহায়তা এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হলে বিশেষায়িত শিল্প গ্রামীণ এলাকাতেও বিকশিত হতে পারে।

সুইডেন সরকার, ম্যারিকো বাংলাদেশ এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় বাস্তবায়িত ‘স্বপ্ন-২’ প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেয়েছেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র নারীদের নিয়মিত কাজ, আয় এবং দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা হয়, যাতে তারা ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারেন। এখন তাঁর লক্ষ্য উৎপাদন আরও বাড়ানো, আরও বেশি নারীকে যুক্ত করা এবং বাংলাদেশে থাকা চীনের সঙ্গে যুক্ত আরও প্রতিষ্ঠানে উইগ ক্যাপ (কৃত্রিম চুল) সরবরাহ করা।

ভবিষ্যতে তাঁর স্বপ্ন আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানো—চীন ও ভারতসহ আরও বড় বাজারে নিজের তৈরি পণ্য পৌঁছে দেওয়া।

নিজের গ্রামের বাইরে বাজার খুঁজে নিয়ে রত্না শুধু একটি ব্যবসাই গড়ে তোলেননি। তিনি তৈরি করেছেন স্থানীয় দক্ষতা ও বৈশ্বিক সুযোগের মধ্যে এক নতুন সেতুবন্ধ।