একটি সেলাই মেশিন, নতুন দক্ষতা আর স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প
সেলাইয়ের সুতোয় বোনা নতুন ভবিষ্যৎ
August 16, 2026
পরিবারের নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় সেলাইয়ের কাজে ব্যস্ত সালেহা বেগম।
সেলাই মেশিনের একটানা গুনগুন শব্দ ৪৩ বছর বয়সী সালেহা বেগমের জন্য এক নতুন জীবনের বার্তা নিয়ে এসেছে। খুলনা সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের নবীনগর এলাকার বাসিন্দা সালেহা এখন সুতো আর সেলাইয়ের ফোঁড়ে নতুন স্বপ্ন বুনছেন। দীর্ঘদিনের অনিশ্চিত আয়ের পর, তিনি এমন এক কাজ শিখেছেন যা তার পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী জীবিকা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে।
তবে আজকের এই পরিবর্তনের পেছনের গল্পটা ছিল বেশ কঠিন। পাঁচ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় তার স্বামী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়লে পুরো পরিবারটি অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। অসুস্থ স্বামী ও প্রতিবন্ধী বড় ছেলেকে নিয়ে সংসারের দৈনন্দিন খরচ, চিকিৎসা আর সন্তানদের পড়াশোনা চালানো তার জন্য এক পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।
“পাঁচ বছর ধরে আমার স্বামী বিছানায় পড়ে আছে। পরিবারে আয়-রোজগার করার মতো একমাত্র মানুষ এখন আমিই,” নিজের পরিস্থিতির কথা বলছিলেন সালেহা।
সেলাই প্রশিক্ষণে যুক্ত হওয়ার আগে সালেহা বাসা-বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। মাসে আয় হতো বড়জোর ৪,০০০ টাকা। অক্লান্ত পরিশ্রম সত্ত্বেও এই সামান্য আয়ে পরিবারের মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটানো যাচ্ছিল না। তিনি জানতেন, পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে একটি স্থায়ী উপার্জনের পথ খুঁজতেই হবে।
সালেহার কাছে সেলাই শেখাটা শুধু নতুন একটা কাজ শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই কাজ তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে, ঘরে বসেই আয়ের পথ খুলে দিয়েছে এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
“এই প্রশিক্ষণ শুধু আমাকে সেলাইয়ের কাজ শেখায়নি, বরং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আর সংসারটাকে টেনে তোলার মতো আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে,” চোখে নতুন স্বপ্ন নিয়ে বলেন সালেহা।
বছরের পর বছর ধরে চলা অনিশ্চয়তার পর, সালেহার এই প্রচেষ্টা তার স্বামীর মনেও আশার আলো জ্বালিয়েছে।
“এক্সিডেন্টের পর দিনরাত খালি দুশ্চিন্তাই করতাম। সালেহা এখন কাজ শেখার চেষ্টা করছে দেখে মনটা শান্ত হয়। ও যদি কাজটা চালিয়ে যেতে পারে, আমাদের এই টানাটানি হয়তো একটু কমবে।”
প্রশিক্ষণ শেষ করে সালেহা এখন ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঘরে বসে সেলাইয়ের মাধ্যমে নিজের একটি ব্যবসা দাঁড় করানোর পাশাপাশি তিনি চান অন্যান্য নারীদেরও স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করতে।
“আমি একটা ছোট পোশাকের ব্যবসা দিতে চাই, যেন আরও মানুষের কাজের সুযোগ হয়। আমার শেখা কাজটা আমি অন্য নারীদেরও শেখাতে চাই, যেন তারা স্বাবলম্বী হয়ে নিজেদের পরিবারকে ভালো রাখতে পারে,” বলেন সালেহা।
সালেহার জীবনে এই বড় পরিবর্তনের সুযোগটা আসে ইউএনডিপির সহায়তায় পরিচালিত একটি সেলাই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে। এই উদ্যোগটি তার মতো প্রান্তিক নারীদের একটি স্থায়ী ও নিরাপদ জীবিকার পথ তৈরিতে সাহায্য করছে।
এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকা সহায়তা’ (Livelihoods Support for Urban Poor Communities in Bangladesh বা LSUPCB) প্রকল্পের আওতায়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ কাজে অংশীদার হিসেবে রয়েছে ইউএনডিপি বাংলাদেশ। বৈশ্বিক উন্নয়ন ও দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা তহবিল (Global Development and South-South Cooperation Fund)-এর মাধ্যমে প্রকল্পটিতে সহায়তা দিচ্ছে চীন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা (China International Development Cooperation Agency বা CIDCA)।
দক্ষতা উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, ঢাকা উত্তর, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও রাজশাহী—এই ছয়টি শহর ও পৌরসভায় ২৫০ জন নারীকে তিন মাসব্যাপী সেলাই ও সেলাই মেশিন পরিচালনা প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে।
সালেহার মতো নারীদের জন্য কাজের এই ব্যবহারিক দক্ষতা আয়-রোজগার ও স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন পথ খুলে দেয়। ঝুঁকিপূর্ণ নগর এলাকার নারীদের কাজের পরিধি বাড়িয়ে এই প্রকল্প পরিবারগুলোর মনোবল বাড়াতে এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ তৈরিতে সাহায্য করছে।