ডিজিটাল দক্ষতায় বদলে যাচ্ছে হাসানের ভবিষ্যৎ
প্রিন্টের দোকানের হেল্পার থেকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প
August 20, 2026
ঘরে বসে মোঃ হাসান যখন গত কয়েক বছরের কথা ভাবেন, তখন নিজের জীবনের পরিবর্তনটা স্পষ্ট দেখতে পান। একসময় যে তরুণ একটি প্রিন্টের দোকানে হেল্পার হিসেবে কাজ করতেন, আজ তিনি নিজের ডিজিটাল দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে একটি ছোট ব্যবসা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। তাঁর আশা, এই ব্যবসা তাঁকে ও তাঁর দাদা-দাদিকে আরও স্থিতিশীল জীবনের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
২০ বছর বয়সী হাসান প্রতিদিন সকালে হেঁটে যান একটি প্রিন্টের দোকানের পাশ দিয়ে। এখানেই একসময় হেল্পার হিসেবে কাজ করতেন তিনি। এখন তাঁর হাতে শুধু কাজের অভিজ্ঞতাই নয়, আছে নতুন কিছু ডিজিটাল দক্ষতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার আত্মবিশ্বাস। আশপাশে সুযোগ কম হলেও, তিনি আর শুধু সুযোগের অপেক্ষায় নেই। নিজের জন্য নতুন কিছু করার পথ খুঁজে নিয়েছেন তিনি।
চট্টগ্রামের তুলাতলী বেড়িবাঁধ সিডিসি এলাকার বাসিন্দা হাসান ছোটবেলা থেকেই আর্থিক সংকটের মধ্যে বড় হয়েছেন। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর দাদা-দাদিই তাঁকে মানুষ করেন। তাঁর দাদা স্থানীয় বাজারের দোকানগুলোতে বস্তা টানার কাজ করেন, আর দাদি অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। দুজনের কঠোর পরিশ্রমের পরও সংসারের প্রতিদিনের খরচ চালানো এবং নিয়মিত আয় নিশ্চিত করা তাঁদের জন্য সহজ ছিল না।
কম্পিউটার প্রশিক্ষণে যোগ দেওয়ার আগে প্রিন্টের দোকানের কাজই ছিল তাঁর আয়ের প্রধান ভরসা। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল, কিন্তু সেগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো প্রযুক্তিগত ও ডিজিটাল দক্ষতা ছিল না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নতুন কিছু শেখা দরকার। নতুন এই দক্ষতাই হয়তো তাঁকে সীমিত সুযোগের বাইরে আরও ভালো কাজের সুযোগ এনে দিতে পারে।
প্রশিক্ষণে এসে তিনি হাতে-কলমে কম্পিউটার ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার শেখার সুযোগ পান। নিয়মিত ক্লাস করতে করতে তিনি বিভিন্ন ডিজিটাল অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করতে শেখেন। ধীরে ধীরে তাঁর আত্মবিশ্বাসও বাড়তে থাকে। এভাবে নতুন দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি, আগে যে ধরনের কাজের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, তার বাইরেও নিজের জন্য নতুন সম্ভাবনা দেখতে শুরু করেন।
“এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমি অনেক নতুন ডিজিটাল দক্ষতা শিখেছি। একই সঙ্গে নিজের স্বপ্ন পূরণ করার আত্মবিশ্বাসও পেয়েছি। এখন আমার বিশ্বাস, একদিন আমি নিজের একটি ব্যবসা দাঁড় করাতে পারব, পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারব এবং নিজের জন্য আরও ভালো একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারব,” বলেন তিনি।
দাদা-দাদির কাছে বড় হওয়া ২০ বছর বয়সী হাসানের শৈশব কেটেছে আর্থিক সংকটের মধ্যে। এখন নতুন ডিজিটাল দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের জন্য আরও স্থিতিশীল আয়ের পথ তৈরি করতে এবং একদিন নিজের একটি ব্যবসা গড়ে তুলতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
তাঁর এই পরিবর্তন তাঁর দাদার চোখেও পড়েছে। নাতি নতুন কিছু শিখছে এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করছে, তা দেখে তিনিও আশাবাদী।
“আমি স্থানীয় বাজারের দোকানগুলোতে বস্তা টানার কাজ করি, আর আমার স্ত্রী অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতে সাহায্য করেন। প্রকল্পের মাধ্যমে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর হাসান একটি ফটোকপির দোকানে কাজ পেয়েছে। এখন সেও সংসারের খরচে কিছুটা সাহায্য করতে পারবে। এই কাজ করতে গিয়ে সে নতুন কিছু শিখছে, অভিজ্ঞতাও হচ্ছে। আমরা আশা করি, প্রকল্পের সহায়তায় শেখা কম্পিউটার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে সে নিজের একটা ব্যবসা দাঁড় করাতে পারবে। এতে আমাদের সংসারের আর্থিক অবস্থার যেমন উন্নতি হবে, তেমনি আমাদের এলাকার আরও কিছু মানুষের কাজের সুযোগও হতে পারে।”
কাজের এই অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে তিনি এখন নিজের এলাকায় একটি ডিজিটাল সার্ভিস ও ফটোকপি সেন্টার চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেখানে এলাকার মানুষ প্রিন্ট ও ফটোকপির সেবা পাবেন। পাশাপাশি, কম্পিউটার ব্যবহার ও বিভিন্ন অনলাইন সেবার ক্ষেত্রেও তাঁর কাছ থেকে সহায়তা নিতে পারবেন। নিজের জন্য একটি নিয়মিত আয়ের সংস্থান করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্য তরুণদেরও কাজের সুযোগ করে দিতে চান তিনি।
তাঁর জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যায় তাঁর এলাকায় কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সুযোগ আসার পর। ইউএনডিপি-সমর্থিত এই উদ্যোগের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সদস্যরা নতুন দক্ষতা শেখার সুযোগ পাচ্ছেন। এর ফলে তাঁরা আরও ভালো ও নিরাপদ আয়ের পথ খুঁজে নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারছেন।
এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকা সহায়তা (Livelihoods Support for Urban Poor Communities in Bangladesh বা LSUPCB) প্রকল্পের আওতায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ কাজে অংশীদার হিসেবে রয়েছে ইউএনডিপি বাংলাদেশ। বৈশ্বিক উন্নয়ন ও দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা তহবিল (Global Development and South-South Cooperation Fund)-এর মাধ্যমে প্রকল্পটিতে সহায়তা দিচ্ছে চীন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা (China International Development Cooperation Agency বা CIDCA)।
দক্ষতা উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, ঢাকা উত্তর, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও রাজশাহী এই ছয়টি শহর ও পৌরসভায় ২১০ জন নারী ও তরুণকে তিন মাসের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বিএমইটি অনুমোদিত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হয়েছে। এতে অংশগ্রহণকারীরা হাতে কলমে ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি জাতীয়ভাবে স্বীকৃত সনদও পেয়েছেন। এসব দক্ষতা তাঁদের চাকরি খোঁজা, নিজের কাজ শুরু করা কিংবা ভবিষ্যতে ব্যবসা বা উদ্যোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কাজে লাগবে।
হাসানের মতো তরুণদের জন্য নতুন একটি দক্ষতা শুধু চাকরির সুযোগ তৈরি করে না, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়। হাতে কলমে শেখার এই অভিজ্ঞতা তাঁদের আরও ভালো জীবিকার পথ খুঁজে নিতে, পরিবারের পাশে দাঁড়াতে এবং নিজেদের এলাকার জন্য কিছু করতে সাহায্য করতে পারে।
হাসানের গল্প তাই শুধু একটি প্রশিক্ষণের গল্প নয়। সীমিত সুযোগের মধ্যেও নতুন কিছু শেখার মাধ্যমে কীভাবে একজন তরুণ নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করতে পারেন, তাঁর গল্প তারই উদাহরণ।