যে নারী রাত কাটান গাছের ঘরে
July 14, 2026
সূর্য ডোবার পর প্রতিদিনই জারিনা বেগম মাটি থেকে প্রায় ২০ ফুট উঁচুতে উঠে যান, নিজের হাতে বানানো একটি গাছের ঘরে। সেখানেই কাটে তাঁর পুরো রাত। শখ বা রোমাঞ্চের জন্য নয়, নিজের জীবন বাঁচাতেই এই ব্যবস্থা। রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলার মারিশ্যা চরে তাঁর বাড়ি। পার্বত্য চট্টগ্রামের এই দুর্গম জনপদে পৌঁছাতে সড়ক ও নৌপথ মিলিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। জায়গাটি এতটাই প্রত্যন্ত যে, গুগল ম্যাপেও সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না।
প্রায়ই এ এলাকায় বুনো হাতির পাল চলে আসে। তাই সন্ধ্যার পর মাটিতে থাকা তাঁর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবেই তিনি গাছের ওপর ছোট্ট একটি ঘর বানিয়েছেন। রাতভর সেখান থেকেই পাহারা দেন নিজের বাগান আর গৃহপালিত প্রাণীগুলোকে। এগুলোই এখন তাঁর জীবনের নতুন ভরসা।
দিনের আলো ফুটতেই মাঠে নেমে পড়েন ৬১ বছর বয়সী এই নারী। অথচ তাঁর সমাজে এখনো অনেকেই মনে করেন, কৃষিকাজ নারীদের নয়, পুরুষদের কাজ। কখনো খরা, কখনো টানা বৃষ্টি—প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি একাই চাষাবাদ করে নিজের সংসার চালিয়ে আসছেন। সুযোগ পেলেই সন্তান আর নাতি-নাতনিদেরও সাহায্য করেন।
তবে সব সময় তাঁর জীবন এমন ছিল না। একসময় মৌসুমি সবজি চাষ করলেও সেভাবে লাভের মুখ দেখতেন না। পোকামাকড় দমন বা হাঁস-মুরগি পালনের সঠিক নিয়ম তাঁর জানা ছিল না। অজানা রোগে একের পর এক মুরগি মারা যেত। ছাগল পালন করলে বাড়তি আয়ের সুযোগ ছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় পুঁজি না থাকায় সেটিও সম্ভব হয়নি। সব মিলিয়ে তিনি যেন একই জায়গায় আটকে ছিলেন।
জারিনার জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে টেকসই জীবিকা গড়ে তোলার উদ্যোগ ক্লাইমেট অ্যাডাপটিভ লাইভলিহুড অপশনস (ক্যালো)-এর মাধ্যমে। কানাডার গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স (জিএসি) এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) যৌথভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় আর্থিকভাবে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিজেদের আয়ের পথ তৈরি করতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীরা ৩২ থেকে ৪৫টি প্রশিক্ষণ সেশনে অংশ নেন। সেখানে ফসল চাষ, হাঁস-মুরগি পালন, বাজারজাতকরণসহ নানা বিষয়ে হাতে-কলমে শেখানো হয়। প্রশিক্ষণের পরও স্থানীয় রেজিলিয়েন্স ফ্যাসিলিটেটররা নিয়মিত তাঁদের বাড়িতে গিয়ে শেখা বিষয়গুলো বাস্তবে কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।
এই সহায়তার অর্থ দিয়ে তিনি একটি ছাগলের বাচ্চা, একটি মোরগ ও দুটি মুরগি কেনেন। নিজের কিছু সঞ্চয় যোগ করে শুরু করেন বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ। সেখানে লাউ, চিচিঙ্গা, শিম, বরবটি ও মিষ্টি কুমড়ার আবাদ করেন। তবে শুরুতে তাঁর মনে সংশয় ছিল। আগের চেষ্টাগুলোর মতো এবারও ব্যর্থ হবেন না তো?
সেই আশঙ্কা সত্যি হয়নি। প্রশিক্ষণ থেকে তিনি জৈব সার ও ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির কৌশল শিখেছেন। শিখেছেন কীভাবে পোকামাকড় দমন করতে হয় এবং ভালো মানের কৃষি উপকরণ সংগ্রহ করতে হয়। আগে যে মুরগিগুলো অল্প বয়সেই মারা যেত, এখন সেগুলো সুস্থভাবে বড় হচ্ছে। ছাগলগুলোও ভালো আছে। বাজারে যাওয়া তাঁর জন্য সহজ নয়। তাই বাড়ি থেকেই বিক্রি করেন সবজি, ডিম আর হাঁস-মুরগি। সেই আয় আবার নিজের খামারেই বিনিয়োগ করেন। এখন তাঁর জমিতে লেবু, কচুশাক আর ডাঁটা শাকও উৎপাদন হচ্ছে।
বর্তমানে মাসে তাঁর আয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে। আয়ের একটি অংশ তিনি সঞ্চয় করেন, আর বাকি অংশ আবার কৃষিকাজে বিনিয়োগ করেন। প্রকল্পের স্থানীয় রেজিলিয়েন্স ফ্যাসিলিটেটররা—যারা নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ ও সহায়তা দেন—এখনো তাঁর পাশে আছেন। নতুন কোনো সমস্যা দেখা দিলে সমাধানের পথ খুঁজে পেতে তাঁকে সহায়তা করেন। এখন তাঁদের মূল লক্ষ্য, জারিনা যেন তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু নিজের সংসারই গুছিয়ে তোলেননি, হয়ে উঠেছেন আশপাশের মানুষেরও অনুপ্রেরণা। প্রতিবেশীরা তাঁর কাছে আসেন পরামর্শ নিতে। জানতে চান, কীভাবে তিনি নিজের জীবন বদলে ফেললেন। তিনিও সবাইকে বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ শুরু করতে উৎসাহ দেন। তাঁর বিশ্বাস, সবাই মিলে চাষাবাদ করলে পুরো সম্প্রদায়ই লাভবান হবে।
তাঁর পথচলার লক্ষ্য শুধু আয় বাড়ানো নয়। দেশীয় সবজির জাত সংরক্ষণেও তিনি সমান আগ্রহী। বেশি ফলনশীল সংকর জাতের বদলে দেশীয় জাতের সবজি চাষ করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাঁর বিশ্বাস, এসব সবজির স্বাদ যেমন ভালো, তেমনি পুষ্টিগুণও বেশি। "আমি আমাদের দেশীয় সবজির জাতগুলো সংরক্ষণ করতে চাই," বলেন তিনি। "ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এগুলোই ভালো পুষ্টির উৎস।"
অসংখ্য প্রতিকূলতার মধ্যেও জারিনা গড়ে তুলেছেন নিজের এক ছোট্ট জগৎ। তাঁর বাগান তাঁকে জীবিকা দেয়, আর সেই অভিজ্ঞতা আজ পথ দেখায় আশপাশের মানুষকেও। প্রতিটি সন্ধ্যায় তিনি আবার উঠে যান নিজের হাতে বানানো সেই গাছের ঘরে। রাতভর পাহারা দেন নিজের পরিশ্রমে গড়ে তোলা সবকিছু। বুনো হাতি, খরা কিংবা জীবনের কোনো প্রতিকূলতাকেই তিনি তাঁর এই অর্জন কেড়ে নিতে দিতে চান না।