এক টুকরো জমি থেকে পরিচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ
July 15, 2026
টেকনাফের হোয়াইক্যং বাজারের পাশে ছোট্ট এক টুকরো জমি। বহু বছর ধরে জমিটি ছিল মো. এনায়েতউল্লাহর পরিবারের। অন্য অনেক পরিবারের মতো তাঁরাও ভাবতেন, এই জমি একদিন পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেবেন। কিন্তু এনায়েতউল্লাহ সেই জমির জন্য ভেবেছিলেন ভিন্ন এক ভবিষ্যৎ।
হোয়াইক্যং বাজারের ময়লা-আবর্জনা আশপাশের খোলা জায়গায় জমে থাকত। প্লাস্টিক, খাবারের উচ্ছিষ্টসহ নানা ধরনের বর্জ্য ড্রেনে, খাল-বিলে কিংবা ফাঁকা জায়গায় ফেলে রাখা হতো। এতে যেমন পরিবেশ নোংরা হতো, তেমনি বাড়ছিল জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি।
তিনি বুঝতে পারছিলেন, এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান দরকার। এমন একটি জায়গা প্রয়োজন, যেখানে বাজারের সব বর্জ্য একত্র করা হবে, প্রয়োজনীয়গুলো আলাদা করা হবে, আর বাকি বর্জ্য নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি জমি।
তাই তিনি নিজের পরিবারের প্রায় ১২ শতক জমি কোনো ভাড়া ছাড়াই ১০ বছরের জন্য মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য দিয়ে দেন। সেই জমিতেই গড়ে ওঠে হোয়াইক্যংয়ের ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি বা বর্জ্য বাছাই ও পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র। এখন বাজারের বর্জ্য প্রথমে এখানে আনা হয়। এরপর প্লাস্টিক, কাগজসহ পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ আলাদা করা হয়। সেগুলো পুনর্ব্যবহারের জন্য পাঠানো হয়। আর বাকি বর্জ্যও নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়।
তিনি বলেন, “আমার মনে হয়েছে, আমার এই জমিটা সমাজের কাজে লাগতে পারে। আমি এমন কিছু করতে চেয়েছি, যাতে পুরো এলাকার মানুষ উপকৃত হয়।”
তাঁর এই উদ্যোগের ফলেই জাপান সরকারের সহায়তায় এবং বাংলাদেশে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাস্তবায়িত ‘সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক হেলথ’ বা টেকসই পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য প্রকল্পের আওতায় হোয়াইক্যংয়ে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রটি গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
তাঁর দেওয়া ১১ দশমিক ৯৪ শতক জমির ওপর গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রটি এখন প্রায় দুই হাজার পরিবার, অর্থাৎ প্রায় ১০ হাজার মানুষকে সেবা দিচ্ছে। আগে যেখানে বাজারের অধিকাংশ বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হতো, এখন তার পরিবর্তে সেগুলো নির্দিষ্টভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে।
প্রতিদিন এখানে প্রায় ১ হাজার ৫৩০ কেজি বর্জ্য আনা হয়। সেখান থেকে প্লাস্টিক, কাগজসহ পুনর্ব্যবহার করা যায় এমন উপকরণ আলাদা করা হয়। আর বাকি বর্জ্যও নিরাপদভাবে সরিয়ে ফেলা হয়। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ টন বর্জ্য সামলানোর সক্ষমতা থাকায় ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষকে এই সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
একসময় বাজারের ময়লা-আবর্জনা ড্রেন, খোলা জায়গা কিংবা আশপাশের জলাশয়ে জমে থাকত। বর্ষাকালে ড্রেন বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হতো। জমে থাকা বর্জ্যে মাছি, মশা ও বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণীর উপদ্রব বাড়ত। এতে দোকানদার, ক্রেতা এবং আশপাশের বাসিন্দাদের প্রতিদিনই নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হতো।
এখন সেই চিত্র ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। চারপাশ আগের তুলনায় অনেক পরিষ্কার। মানুষও বুঝতে শুরু করেছেন, বর্জ্য শুধু ফেলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তুলতে সবারই ভূমিকা আছে।
তবে পরিবর্তনটা শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি বলেন, “আগে মানুষ ভাবত, ময়লা মানেই ফেলে দেওয়ার জিনিস। এখন তারা বুঝতে পারছে, বর্জ্যের মূল্যও আছে।”
এই কেন্দ্র স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন আয়ের সুযোগও তৈরি করেছে। আগে যাঁরা বর্জ্য সংগ্রহ বা পুরোনো জিনিস কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এখন তাঁদের কাজ আরও গুছিয়ে করার সুযোগ হয়েছে। আগে যেসব প্লাস্টিক, কাগজ বা অন্য উপকরণ বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হতো, এখন সেগুলো আলাদা করে বিক্রি করা হচ্ছে বা আবার ব্যবহারের জন্য পাঠানো হচ্ছে। এতে একদিকে মানুষের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে চারপাশও থাকছে আরও পরিচ্ছন্ন।
প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ইউএনডিপি ও জাপান সরকার এনায়েতউল্লাহর ব্যক্তিগত উদ্যোগকে পুরো এলাকার মানুষের জন্য একটি কার্যকর সেবায় পরিণত করতে সহায়তা করেছে।
তবে শুধু একটি কেন্দ্র গড়ে তুললেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। এনায়েতউল্লাহ শুরুটা করে দিয়েছেন। এখন এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পুরো এলাকার মানুষের। স্থানীয় পরিবার, দোকানদার, বর্জ্য সংগ্রহকারী, বাজার কমিটি ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠান—সবাই একসঙ্গে কাজ করলেই এই পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হবে।
তিনি বলেন, “আমি যদি জমি দিতে এগিয়ে না আসতাম, তাহলে হয়তো এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হতো না। আমার আশা, যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁরাও নিজেদের এলাকার মানুষের উপকারে এভাবে এগিয়ে আসবেন।”
আজ তাঁর একটি সিদ্ধান্ত প্রতিদিন হাজারো মানুষের উপকারে আসছে। হোয়াইক্যংয়ের এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র দেখিয়ে দেয়, একজন মানুষের উদ্যোগ, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা এবং সঠিক সহায়তা একসঙ্গে থাকলে বড় পরিবর্তন সম্ভব।