বাঁশ-বেতের ঝুড়িতে বোনা একটি পরিবারের নতুন জীবন
July 19, 2026
জামালপুরে ফটিকজান বেগমের বাড়িতে সকাল হলেই শুরু হয়ে যায় কাজ। কেউ বাঁশ কাটেন, কেউ বেত বাঁকান, কেউ খাতায় টুকে রাখেন অর্ডারের হিসাব। ফটিকজানের বয়স ৪০। তাঁর হাতেই বাঁশ আর বেত দিয়ে তৈরি হয় ঝুড়ি, ট্রে, কুলাসহ নানা পণ্য। এই উপার্জনেই এখন চলে তাঁদের পুরো সংসার। শুধু তিনি একা নন, তাঁর সঙ্গে হাত লাগান তাঁর বৃদ্ধ মা আর বড় ছেলে।
কিন্তু সবসময় জীবনটা এমন ছিল না।
আজ থেকে প্রায় ১০ বছর আগের কথা। তখন তিনি দ্বিতীয় সন্তানের মা হতে চলেছেন। সেই সময়ই স্বামীকে হারান। হঠাৎ করেই সব দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর একার কাঁধে। দুই ছেলেকে বড় করতে হবে। বৃদ্ধ মাকেও দেখতে হবে। অথচ হাতে নেই কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস।
যে কাজই পেতেন, সেটাই করতেন। কিন্তু সেই কাজে না ছিল নিশ্চয়তা, না ছিল ভালো মজুরি। প্রতিদিন সংসার চালানোই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় লড়াই। ভবিষ্যতের কথা ভাবতেই ভয় পেতেন।
একসময় আবার মন দেন বহুদিনের চেনা কাজে—বাঁশ আর বেত দিয়ে নানা জিনিস বানানো। এই কাজ তিনি আগে থেকেই জানতেন। শুরুতে বানাতেন কয়েকটা ঝুড়ি, কয়েকটা কুলা। লক্ষ্য ছিল শুধু একটু বাড়তি আয়। কিন্তু আস্তে আস্তে এই ছোট্ট কাজই হয়ে ওঠে তাঁর নতুন জীবনের ভিত।
বড় পরিবর্তনটা আসে যখন তিনি যুক্ত হন ‘স্বপ্ন’ (SWAPNO) প্রকল্পের স্থানীয় সরকার বিভাগ ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) যৌথভাবে, সুইডেন সরকার এবং বেসরকারি খাতের অংশীদার ম্যারিকো বাংলাদেশের সহযোগিতায় ‘স্বপ্ন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্প থেকে ফটিকজান ব্যবসা পরিচালনার প্রশিক্ষণ পান। শেখেন মোবাইল ফোনে হিসাব রাখা, অর্ডার নেওয়া আর ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা। সঙ্গে পান প্রয়োজনীয় কিছু সরঞ্জাম ও আর্থিক সহায়তা।
নতুন করে অন্য কোনো কাজ শুরু করতে হয়নি তাঁকে। যে কাজ তিনি আগে থেকেই করতেন, সেটাই এবার আরও ভালোভাবে করার সুযোগ পান। বেঁচে থাকার জন্য যে কাজ শুরু করেছিলেন, সেটাই আজ তাঁর পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস।
আজ এই কাজে জড়িয়ে আছে তিন প্রজন্ম। পুরো কাজ দেখেন তিনি নিজে। তাঁকে সাহায্য করেন তাঁর মা, জিনিস তৈরি আর গুছিয়ে রাখার কাজে। বড় ছেলে পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে মোবাইলে হিসাব রাখে, অর্ডারের তথ্য টুকে রাখে। একসময় যা ছিল তাঁর একার লড়াই, আজ সেটাই পুরো পরিবারের কাজ। এই উদ্যোগ থেকে এখন প্রতি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা (প্রায় ১২৩ মার্কিন ডলার) আয় হয়।
এখন তিনি শুধু ঘরে বসে থাকেন না। নিয়মিত যান বাজারে। গ্রামের অনেক বাজারে এখনো নারীদের উপস্থিতি খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দরদাম করেন, আগে থেকে অর্ডার নেন, নিজের বানানো জিনিস বিক্রি করেন। এখন তিনি নিজেকে দেখেন একজন ব্যবসায়ী হিসেবে। সংসারের সিদ্ধান্তেও তাঁর কথার গুরুত্ব বেড়েছে।
তাঁর স্বপ্ন এখনো অনেক বড়। কাজ আরও বাড়াতে চান তিনি। পৌঁছাতে চান বড় বাজারে। শুধু নিজের জন্য নয়, এলাকার আরও মানুষের জন্যও আয়ের সুযোগ তৈরি করতে চান তিনি।
ফটিকজানের গল্প দেখিয়ে দেয়, সঠিক সুযোগ আর প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে প্রতিকূলতার মধ্যেও নতুন করে শুরু করা সম্ভব। একসময় যে লড়াই ছিল শুধু টিকে থাকার, আজ সেটিই হয়ে উঠেছে পুরো পরিবারের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ।