জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জন
স্রোতের বিপরীতে: শেফালির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
May 8, 2025
শেফালি আক্তারের স্মৃতিতে যতদূর মনে পড়ে, উপকূলীয় বাংলাদেশের নদীগুলির সাথে তার জীবন জড়িয়ে ছিল ওতপ্রোতভাবে। তাদের সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য। দক্ষিণাঞ্চলীয় পটুয়াখালী জেলার নৌকাবাসী বেদে সম্প্রদায়ে জন্ম নেওয়া শেফালির দিন কাটতো নদীর জলে জাল ফেলে আর ঝড়ঝঞ্ঝার সাথে লড়াই করে। "বাবা যখন মারা যায়, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। মা আমাকে একা হাতে বড় করেছে। আমরা এত দারিদ্র্যের মধ্যে ছিলাম যে মাঝেমাঝেই আমাদের এক বেলার খাবারটুকুও জুটতো না,” তিনি মৃদুস্বরে বলেন।
চর মোন্তাজ - ক্রমশ পরিবর্তনশীল নদীর তীর আর উত্তাল সমুদ্র দিয়ে ঘেরা একটি নির্জন, বিচ্ছিন্ন চর - যেখানে টিকে থাকা কারও জন্য সহজ না। আর শেফালির মতো নারীদের জন্য তো তা আরও কঠিন সংগ্রাম। দ্বীপটি দুর্গম হওয়ায় সেখানে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের সুযোগসুবিধা অপ্রতুল। বেশিরভাগ পরিবার নিরাপদ জীবিকা, স্বাস্থ্যসেবা বা নির্ভরযোগ্য শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত। সেই সাথে এখন যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছে।
এককালে যে নদীগুলো ছিল মানুষের জন্য পরম উদার আশ্রয়, এখন সেগুলো হয়ে পড়েছে দুর্বোধ্য, অশান্ত। বাড়ছে জোয়ার, ঢুকে পড়ছে লবণাক্ততা, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ভাসিয়ে নিচ্ছে ঘর-বাড়ি, কেড়ে নিচ্ছে জীবিকা। বেঁচে থাকার নিত্যদিনের সংগ্রামকে আরও কঠিন করে তুলেছে। শেফালি বলেন, “প্রায়ই আমরা সারা রাত জেগে নৌকার দড়ি ধরে বসে থাকতাম, ভয়ে যে তীব্র ঝড়ো হাওয়ায় যদি ভেসে চলে যাই”।
অবশেষে যখন শেফালি এবং তার পরিবারকে চর মোন্তাজে স্থানীয় সরকার একটি ছোট বাড়ি করে দেয়, তখন মনে হয়েছিল এবার বুঝি তাদের পায়ের তলার মাটি শক্ত হয়েছে - আক্ষরিক অর্থেই। কিন্তু সমতল ভূমিতেও জীবিকার সুযোগসুবিধা খুব কম ছিল। তাই তার স্বামী এবং ছেলে মাছ ধরা চালিয়ে গেলেন। যদিও খুব কম মাছ ধরা পড়তো, কিন্তু তাদের অন্য কোনও উপায় ছিল না।
তারপর আশার আলো হয়ে এলো লোকাল গভার্নমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (Local Government Initiative on Climate Change- LoGIC)বা “জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে স্থানীয় সরকারের উদ্যোগ”, একটি যৌথ প্রকল্প, যা পরিচালিত হচ্ছে ইউএনডিপি, ইউএনসিডিএফ, সুইডেন, ডেনমার্ক এবং বাংলাদেশের সরকারের সহায়তায় । এই প্রকল্পের মাধ্যমে এখন শেফালি এবং তার মত অন্য নারীরা নিজেদের জীবনের কঠিন বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য কাজ করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের কেন্দ্র করে, প্রকল্পের ক্লাইমেট অ্যাডাপ্টিভ লাইভলিহুড অপশনস (Climate Adaptive Livelihood Options- CALO) অর্থাৎ জলবায়ুর সাথে মানানসই জীবিকার সুযোগ এবং কমিউনিটি রেজিলিয়েন্ট ফান্ড (Community Resilient Fund- CRF) অর্থাৎ জনগোষ্ঠীর জন্য স্থিতিশীল তহবিল কার্যক্রমের অধীনে তাদের প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। যাতে তারা জলবায়ুর সাথে মানিয়ে জীবিকা গড়তে পারেন।
এই উদ্যোগ চরের ১,২০০ জনেরও বেশি নারীর কাছে পৌঁছেছে, তাদের মধ্যে শেফালি ছিলেন একজন। তারা সিআরএফ CRF সহায়তায় ৩০,০০০ টাকা (২৪৭ মার্কিন ডলার) পান। মাত্র ৪,০০০ টাকা (৩৩ মার্কিন ডলার) দিয়ে, তিনি তার নতুন বাড়ির পাশে একটি দোকান শুরু করেন - কাঠ, টিন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘নিজের দৃঢ় সংকল্প’ দিয়ে এটি তৈরি। "এই ধাক্কাটা দরকার ছিল," তিনি হেসে বললেন। "আমি মাছ ধরার জাল বিক্রি দিয়ে শুরু করেছিলাম, যেহেতু এই কাজে আমি দক্ষ। ধীরে ধীরে যোগ হয় তেল, সাবান, দেশলাই—আরও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। সর্বশক্তিমানের কৃপায়, বিক্রি বেড়েছে, সেই সাথে বেড়েছে আমাদের আশাও।"
তার একসময়ের ছোট্ট কাঠের দোকান থেকে এখন যা আয় হয় সেটা তার কল্পনার চেয়েও বেশি। তিনি এবং সাথের অন্য নারীরা তাদের দলীয় কার্যক্রম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন, যাতে সম্মিলিত কেনাকাটা এবং সঞ্চয় আরও কার্যকর হয়। শেফালির মতে "আমাদের বিশ্বাস সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে আমরা আরও বেশি লাভবান হব”।
শেফালির জন্য দোকানটি এখন তার জীবিকার চেয়েও বেশি কিছু- যেন তীরহারা ঢেউয়ের সাগরে ভাসতে ভাসতে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া একটি নোঙর। তার সন্তানেরা এখন নিয়মিত স্কুলে যায়। তার পরিবার দিনে তিনবেলা খাবার খায়। এবং সবচেয়ে বড় কথা, তিনি তার জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আগে প্রতিটি দিনই ছিল কেবল বেঁচে থাকার লড়াই। এখন আমি ঘুম থেকে উঠে ভাবি কিভাবে জীবনের আরও উন্নতি হবে, কিভাবে আমার মেয়ের জন্য এমন শিক্ষা নিশ্চিত করবো যা আমি কখনও পাইনি।”
জলবায়ু পরিবর্তনের জোয়ার এখনও চর মোন্তাজের জন্য বড় হুমকি। তবে শেফালি আর প্রকৃতির করুণার উপর নির্ভরশীল নন। মনে সাহস নিয়ে তিনি নিজের এবং তার সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনে স্থিতিশীলতা এনেছেন। “আমি জানি নদী যেকোনো সময় উত্তাল হয়ে উঠতে পারে, আমাদের ভূমি ধ্বসে যেতে পারে। কিন্তু এবার আমি সেসব মোকাবিলা করতে প্রস্তুত, দাঁড়িয়ে আছি নিজের পায়ে” তিনি দৃঢ়চিত্তে বললেন।