৩৩ বছর পর মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপর প্রথম প্রশিক্ষণ

May 17, 2026
Woman in headscarf sorting waste into red green and blue bins in a hallway wearing yellow gloves.

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চল লংগদু। পাহাড়ী এই জনপদের একটি ছোট্ট স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, যার নাম- রাঙামাটির লংগদু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এখানেই, ৬০ বছর বয়সী বিলকিস বেগম, গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে, হাসপাতালের বর্জ্য পরিষ্কারের কাজ করে আসছেন।

প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু হয় তার ব্যস্ততা। রোগীদের ওয়ার্ড পরিষ্কার করা, সংক্রামক বর্জ্য সংগ্রহ ও বহন করা, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, রক্তমাখা ব্যান্ডেজ কিংবা ভাঙা কাঁচ সরিয়ে নেওয়া, সবই তার দৈনন্দিন কাজের অংশ। বছরের পর বছর ধরে, তিনি হাসপাতালের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোর একটি করে গেছেন- নীরবে। অথচ, এই দীর্ঘ ৩৩ বছরে, নিরাপদ উপায়ে হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে, কোনো আনুষ্ঠানিক বা স্বীকৃত প্রশিক্ষণ কখনও পাননি। বিলকিস বেগম এই কাজ করে গেছেন, প্রায় কোনো ধরণের সুরক্ষা ছাড়াই। এই যেমন, বুট জুতার বদলে তাঁর পায়ে থাকত সাধারণ স্পঞ্জের স্যান্ডেল। হাসপাতালের সব ধরনের বর্জ্যই ফেলতে হতো একই ময়লার বিনে। ব্যবহৃত সুচ, রক্তমাখা গজ, ভাঙা কাঁচ, স্যালাইনের ব্যাগ কিংবা খাবারের উচ্ছিষ্ট- কোনো কিছুই আলাদা করা হতো না। ফলে কাজ করতে গিয়ে হাত-পা কেটে যাওয়া বা আঘাত পাওয়া যেন- ধীরে ধীরে তাঁর জীবনের স্বাভাবিক এক অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

একদিন, হাসপাতালের পেছনে খোলা জায়গায় ময়লা ফেলতে গিয়ে, হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যান বিলকিস। তাঁর পা ভেঙে যায়। এখানেই শেষ নয়, আজও তাঁর একটি ঘটনার কথা স্পষ্ট মনে আছে। একবার ময়লা তুলতে গিয়ে, ব্যবহৃত একটি সুচ তাঁর আঙুলে বিঁধে যায়। “সঙ্গে সঙ্গে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে শুরু করে। আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিল, যদি কোনো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে যাই!” স্মৃতিচারণ করেন বিলকিস।

সেই সুচ ফোটার ক্ষতটা হয়তো শুকিয়ে যায়, কিন্তু ভয়টা দীর্ঘদিন তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। দিনের পর দিন ময়লা-আবর্জনার ভেতর কাজ করার পর, যে তীব্র দুর্গন্ধ তাঁর শরীরে লেগে থাকত, কাজ শেষে বাড়ি ফিরে সেই দুর্গন্ধ যেন আরও তীব্র হয়ে উঠত। অনেক সময় তিনি বমি বমি অনুভব করতেন, এমনকি কিছু খেতেও ইচ্ছে করত না। সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল একটাই, প্রতিদিন যে ঝুঁকির মধ্যে তিনি কাজ করছেন, তা যেন কোনোভাবেই তাঁর পরিবারের জন্য বিপদ ডেকে না আনে। তাঁর কারণে পরিবারের কেউ যেন কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত না হয়! 

Woman in a patterned hijab stands in front of a clinic entrance, with a white van parked on the right.

আমাদের স্বাস্থ্যসেবায়, বিলকিসদের মতো পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা, নীরবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চলে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট । চিকিৎসক ও নার্সরা যখন রোগীদের চিকিৎসা দেন, এর ফলে যে বিপজ্জনক বর্জ্য তৈরি হয়, তার পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাঁধে। সংক্রামক আবর্জনা বা বর্জ্য, দূষিত সব ব্যবহৃত উপকরণ, আর উপচে পড়া ময়লার বিন, একাধারে সবকিছুই তাঁদের সামলাতে হয়। অথচ অধিকাংশ সময়ই তাঁদের কাজের স্বীকৃতি থাকে না, আর প্রয়োজনীয় সুরক্ষার ব্যবস্থাও থাকে অত্যন্ত সীমিত।

পার্বত্য চট্টগ্রাম; যেখানে হাসপাতালগুলো দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করছে, সেখানে অনিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই সমস্যার প্রভাব কেবল হাসপাতালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আশপাশের সাধারণ মানুষ ও পরিবেশকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। কখনও হাসপাতালের বর্জ্য খোলা জায়গায় পুড়িয়ে ফেলা, আবার দিনের পর দিন খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হয়েছে। ফলত, স্বাস্থ্যকর্মী থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দারা; প্রতিনিয়ত দূষণ ও সম্ভাব্য সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে থেকেছেন। 

তবে, ২০২৩ সাল থেকে ধীরে ধীরে সেই বাস্তবতার পরিবর্তন শুরু হয়। জাপান সরকারের সহায়তায়, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (United Nations Development Programme) এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ২৬টি হাসপাতালে, স্বাস্থ্যসেবায় সংক্রামক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি চালু করা হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে সংক্রামক বর্জ্য বা ময়লা সংগ্রহ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আরও নিরাপদ ব্যবস্থা মেনে চলা হয়। তবে এই কর্মসূচি শুধু অবকাঠামো উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; প্রতিদিন যারা সরাসরি এই বর্জ্য সামলান, তাদের নিরাপত্তা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকেও দেওয়া হয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। এর আওতায় শত শত স্বাস্থ্যকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও স্থানীয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ- নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষা বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পান।

পরিবর্তনটা যেমন দ্রুত, তেমনি হয় ফলপ্রসূ। এখন কাজ করার সময়, বিলকিস হাতে গ্লাভস, মুখে মাস্ক, পায়ে বুট জুতা আর গায়ে সুরক্ষামূলক পোশাক পরে নেন। হাসপাতালের সমস্ত ময়লা-আবর্জনা, এখন আলাদা আলাদা রঙের ডাস্টবিনে রাখা হয়। ফলে কোন ময়লা কোথায় ফেলা হবে, তা বোঝা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি বর্জ্য সংগ্রহও আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ হয়েছে। বিলকিস বলেন, “আমি এখন বুঝতে পারি কোন ধরণের ময়লা কোথায় ফেলতে হবে, আর কাজের সময় নিজেকে তাই অনেক বেশি নিরাপদ মনে হয়।” এখন তিনি হাসপাতালের রোগীদেরও সচেতন করেন। পাশাপাশি কীভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে হয়, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আরও দুইজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকেও সে বিষয়ে পরামর্শ দেন। ট্রেনিংয়ে যা কিছু শিখেছেন, কর্মক্ষেত্রের এ পর্যায়ে এসে, সেটাই এখন অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে রাঙামাটিতে হাসপাতালের চিকিৎসা বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের আধুনিক প্রযুক্তিও চালু করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে একটি সংক্রামক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট উদ্বোধন করা হয়।যা পুরো অঞ্চলের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করে তুলেছে।

খোলা জায়গায় ময়লা ফেলে রাখা বা পুড়িয়ে ফেলার পরিবর্তে, বর্তমানে হাসপাতালগুলো আধুনিক জীবাণুমুক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে, সংক্রামক বর্জ্য নিরাপদভাবে প্রক্রিয়াজাত করছে। এর ফলে যেমন পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি কমছে, তেমনি স্বাস্থ্যকর্মী ও স্থানীয় মানুষের জন্যও তৈরি হচ্ছে আরও নিরাপদ পরিবেশ।

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিলকিস কাজ করছেন, ভয় আর অনিশ্চয়তা নিয়ে। তাই পরিবর্তনটা তিনি এখন ভেতর থেকে টের পান। তিনি এখন আত্মবিশ্বাসের সাথে কাজ করেন, তাতে নেই কোন ভয়-সংকোচ বা সংক্রমনের ঝুঁকি। কিছুদিন বাদে অবসরে যাবেন বিলকিস, তাঁর আশা একটাই, তাঁর মত কেউ যেন আর এরকম ভয় বা ঝুঁকি নিয়ে, বছরের পর বছর কাজ করে যেতে না হয়! বিলকিস বলেন, 

“এই সেক্টরে প্রশিক্ষণ ছাড়া কারও কাজ করা উচিত না, এই প্রশিক্ষণ মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।”