প্রতিকূল জলবায়ুর মাঝেও খাদিজার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
July 15, 2026
ভবিষ্যতে নিজের সমন্বিত খামার আরও বড় করতে চান খাদিজা। তাঁর আশা, এর মাধ্যমে এলাকার আরও নারীর কাজের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠেই কাজে নেমে পড়েন খাদিজা আক্তার। সবজিক্ষেতের পরিচর্যা, গরুর দেখভাল, পুকুরের মাছকে খাবার দেওয়া—এসব কাজেই কেটে যায় তাঁর দিন। অথচ কিছুদিন আগেও পরিবারের জন্য দুবেলা খাবার জোগাড় করতেই তাঁকে হিমশিম খেতে হতো।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে থাকেন তিনি। এ অঞ্চলে কৃষিকাজ দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ছে, বৃষ্টিপাতও হচ্ছে অনিয়মিত। বন্যা ও ঘন ঘন বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রায়ই ফসলের ক্ষতি হয়। এর প্রভাব পড়ে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর জীবনেও। তাঁর সংসারও এর ব্যতিক্রম নয়।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয় তাঁর। ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন। "অনেক দিনই বুঝতে পারতাম না, পরের বেলার খাবার কীভাবে জুটবে," সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে বলেন খাদিজা। "ফসল নষ্ট হয়ে গেলে বা কাজ না থাকলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যেত।"
‘স্বপ্ন’ (SWAPNO) প্রকল্প শুধু খাদিজার কাজের সুযোগই তৈরি করেনি। নতুন দক্ষতা শিখে নিজের আয়ের পথ গড়ে তোলার পাশাপাশি জলবায়ুর প্রতিকূলতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগও করে দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় এলাকার অনেক নারীর মতো তাঁরও নিয়মিত আয়ের সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। তবে তাঁর জীবনে পরিবর্তনের শুরু হয় স্থানীয় ইউনিয়নের মাধ্যমে ‘স্বপ্ন’ (SWAPNO) প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার পর। স্থানীয় সরকার বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), সুইডেন সরকার এবং বেসরকারি খাতের অংশীদার ম্যারিকো বাংলাদেশের সহযোগিতায় পরিচালিত এই কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের নিয়মিত কাজের সুযোগ, প্রশিক্ষণ এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়। খাদিজার জন্য এটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়।
প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত পরামর্শের মাধ্যমে তিনি এমন কিছু কৃষি কৌশল শিখেছেন, যা পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে চাষাবাদ করতে সাহায্য করে। তিনি সবজি চাষ, গবাদিপশু পালন এবং মাছ চাষের ওপর প্রশিক্ষণ পান। পাশাপাশি শেখেন, এসব কার্যক্রম একসঙ্গে পরিচালনা করলে কোনো একটি খাতে ক্ষতি হলেও অন্য খাত থেকে আয় করে সেই ঘাটতি সামাল দেওয়া সম্ভব।
তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন একটি সমন্বিত খামার। এখানে সবজি চাষ, গবাদিপশু পালন এবং মাছ চাষ—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে কোনো একটি খাত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাজারের দামের ওঠানামায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য খাত থেকে আয় করে সেই ক্ষতি অনেকটাই সামলে নেওয়া যায়। বর্তমানে তাঁর এই খামার থেকে মাসে প্রায় ১৬ হাজার টাকা (প্রায় ১৩০ মার্কিন ডলার) আয় হয়। এতে তাঁর পরিবারের জন্য নিয়মিত আয়ের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস তৈরি হয়েছে।
খামারের কাজ বেড়ে গেলে তিনি স্থানীয় শ্রমিকদেরও কাজে নেন। এতে তাঁর কাজের সুবিধা হওয়ার পাশাপাশি এলাকার আরও কয়েকজন মানুষের আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। তাঁর খামার থেকে উৎপাদিত সবজি, মাছ ও দুধ স্থানীয় মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণেও ভূমিকা রাখছে। সময়ের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকলে আশপাশের মানুষও তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে শুরু করেন। ভালো চাষাবাদ, গবাদিপশুর পরিচর্যা কিংবা নিজের আয়ের নতুন পথ তৈরি করা—এসব বিষয়ে এখন অনেকেই তাঁর পরামর্শ চান।
খাদিজার স্বপ্ন, তাঁর সমন্বিত খামার আরও বড় করা। তিনি চান, এর মাধ্যমে এলাকার আরও নারীর কাজের সুযোগ তৈরি হোক।
অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। এখন পরিবার ও সমাজের বিভিন্ন বিষয়ে নিজের মতামত আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে পারেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় চিন্তা এখন মেয়ে হালিমার ভবিষ্যৎ।
খাদিজা বলেন, "একসময় আমি ভাবতাম, স্বপ্ন দেখার অধিকার হয়তো আমার নেই। এখন আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি। সামনে যত চ্যালেঞ্জই আসুক না কেন, আমি জানি আমার পরিবারের দায়িত্ব আমি নিতে পারব।"
তিনি চান, হালিমা যেন পড়াশোনা শেষ করতে পারে। জীবনে এমন সব সুযোগ পাক, যা তিনি নিজে কখনো পাননি।
ভবিষ্যতে তিনি খামার আরও বড় করতে চান। তাঁর আশা, এতে এলাকার আরও নারীর কাজের সুযোগ হবে। নিজের আয় করে তাঁরাও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারবেন।
খাদিজার পথচলা মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যতই থাকুক না কেন, সঠিক সহায়তা আর সুযোগ পেলে মানুষ সেই প্রতিকূলতার সঙ্গেও খাপ খাইয়ে এগিয়ে যেতে পারে। আর সেখান থেকেই শুরু হতে পারে একটি পরিবারের নতুন ভবিষ্যতের গল্প।