খুলনায় ওসিমা হালদার দিন বদলের গল্প গড়ছেন, ভাঙছেন জেন্ডার বাধা

একজন বিধবা নারী এখন শুধু সংগ্রাম করে টিকে নেই বরং নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপকূলের মানুষের মাঝে আর ভাঙছেন পুরোনো সামাজিক প্রথা।

August 7, 2025
Woman smiling and holding two live crabs, wearing a colorful sari, in a market setting.
©UNDP Bangladesh

খুলনার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম পানা। এখানেই থাকেন ৪৮ বছর বয়সী বিধবা ওসিমা হালদার। ঝড়, লবণাক্ততা আর প্রথার বেড়াজালে ঘেরা এই অঞ্চলে তিনি নারীর ভূমিকাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছেন। একসময় নিজের বেঁচে থাকার লড়াই যিনি করতেন নিঃশব্দে, আজ তিনিই হয়ে উঠেছেন পরিবর্তনের এক প্রেরণা।

বদলের আগের জীবন

স্বামীকে হারিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ওসিমা দিনমজুরের কাজ করেছেন। প্রতিদিন চার ঘণ্টা হেঁটে পানীয় জল আনতেন, কিন্তু সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সামর্থ্য ছিল না। জলবায়ু পরিবর্তন তার জীবনে আরও বিপদ ডেকে আনে — ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর লবণাক্ত পানিতে নষ্ট হয়ে যায় মিঠা পানির উৎস। গ্রামবাসীদের অনেকেই বাধ্য হন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর চিংড়ি চাষে ঝুঁকতে।

বদলের শুরু

২০২০ সাল ছিল ওসিমার জীবনে একটি মোড় ঘোড়ার বছর। সে সময় তিনি যুক্ত হন জেন্ডার-রেসপনসিভ কোস্টাল অ্যাডাপটেশন (GCA) প্রকল্পে। মনপুরা নারী জীবিকায়ন গ্রুপের ২২ সদস্যের মধ্যে তিনি নির্বাচিত হন নেত্রী হিসেবে। প্রকল্পের সহায়তায় তিনি কাঁকড়া চাষ ও হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদনের মতো জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ নেন।

নারীর হাত ধরে বদল

প্রকল্পে যুক্ত হয়ে ওসিমা শুধু নিজের জীবনই পাল্টাননি, বদলে দিয়েছেন আশেপাশের নারীদের জীবনও। আগে যারা কেবল গৃহস্থালির কাজেই সীমাবদ্ধ ছিলেন, তারা এখন কাঁকড়া খামার পরিচালনা করছেন, রাতেও পাহারা দিচ্ছেন — যা এক সময় ছিল শুধুই পুরুষদের কাজ। কাঁকড়া চাষ থেকে গত বছরে প্রতিজন নারীর আয় ছিল গড়ে ১০,০০০ টাকা। এই আয় শুধু সংসারে সহযোগিতা নয়, তাদের আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক মর্যাদাও বাড়িয়েছে।

হাইড্রোপনিক্স চাষের ফলে তাদের খাবারের তালিকায় যোগ হয়েছে টাটকা সবজি। এতে পুষ্টি বেড়েছে, কমেছে বাজারের ওপর নির্ভরতা।

মানসিকতার পরিবর্তন, জীবনের পরিবর্তন

আর্থিক স্বাধীনতা নারীদের কণ্ঠস্বর জোরালো করেছে। এখন তারা পরিবার ও সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিচ্ছেন। পুরুষরাও পাশে দাঁড়াচ্ছেন – স্ত্রী ও কন্যাদের জীবিকা গঠনে দিচ্ছেন সমর্থন। এক সময় যারা নির্ভরশীল ছিলেন, তারা এখন হয়ে উঠছেন উপার্জনকারী, রক্ষক ও নেত্রী।

সংগ্রামে গড়ে ওঠা এক নেত্রী

ওসিমা হালদারের গল্প শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়; এটি একটি কমিউনিটির ভাবনা বদলে দেওয়ার গল্প। তিনি নারীদের একত্র করেছেন, তাদের আত্মবিশ্বাসী করেছেন, এবং লিঙ্গবৈষম্যের পুরনো দেয়াল ভেঙেছেন। তার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, জেন্ডার ট্রান্সফরমেশন কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়—এটা বাস্তবে দেখা, ছোঁয়া ও অনুভব করার মতো এক পরিবর্তন।

এই বদলের পেছনে রয়েছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) কর্তৃক মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এবং Green Climate Fund-এর অর্থায়নে বাস্তবায়িত জেন্ডার-রেসপনসিভ কোস্টাল অ্যাডাপটেশন (GCA) প্রকল্প। জলবায়ু-সহনশীল জীবিকা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নারীর নেতৃত্ব তৈরির মাধ্যমে এই প্রকল্প উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করছে এবং পাশাপাশি লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখছে।

পানার মতো গ্রামগুলোতে এই উদ্যোগ শুধু জীবন ও জীবিকা রক্ষা করছে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গড়ে তুলছে নতুন এক সমাজচিত্র — যেখানে নারীরা আছেন সম্মানের আসনে, নেতৃত্বের শিখরে।