জয়া আহসানের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন আসলে কী?

November 9, 2025
Person wearing blue cap and blue vest sits cross-legged on a green mat, holding a green coconut.

জলবায়ু পরিবর্তন আসলে কী? আর এটি সেই মানুষদের জীবনে কেমন প্রভাব ফেলে, যারা কি না প্রতিদিন এর মুখোমুখি হন?

বাংলাদেশে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর শুভেচ্ছা দূত অভিনেত্রী জয়া আহসান উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের কথা শোনার পর এটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। তাদের টিকে থাকা, সংগ্রাম ও সাহসের গল্পগুলো তার কাছে জলবায়ু পরিবর্তন ও সহনশীলতার প্রকৃত অর্থকে নতুনভাবে তুলে ধরে।

সম্প্রতি তিনি খুলনার দাকোপ সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি স্থানীয় জনগণের সাথে সময় কাটান এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের জলবায়ু পরিবর্তন উদ্যোগ বা ইনিশিয়েটিভ অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (LoGIC), যা, ইউএনডিপি এবং ইউএনসিডিএফ- এর যৌথ উদ্যোগে এবং সুইডেন ও ডেনমার্কের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্প, ঘুরে দেখেন। সেখানে জয়া এমন সব নারীর গল্প শোনেন যাদেরকে এক কলস বিশুদ্ধ পানির জন্য প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটতে হয়।

আর এই ব্যাপারে তিনি তার অনুভূতি এভাবেই তুলে ধরেন -“শহরে আমরা প্রায়ই পানি অপচয় করি, প্রকৃত মূল্যটা অনুধাবন করি না। কিন্তু এখানে পানির এক একটি ফোঁটা অমূল্য”।  এটাই একদিকে টিকে থাকা আর অন্যদিকে সহজে পাওয়া জিনিস অবহেলার মধ্যেকার পার্থক্য।

জয়া আরও বলেন, “গর্ভবতী ও সদ্য মা হওয়া নারীদের গল্প শুনে বুঝলাম আসলেই পানির আরেকটি নাম জীবন।” তিনি এক গর্ভবতী নারীর কথা শোনেন যিনি বহু দূর হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু ফিরে এসে দেখেন তার একমাত্র গবাদি পশুটি মারা গেছে। “তারা কাঁদছিল,” ধীরে বললেন জয়া। “আমি জীবনে এমন কষ্ট আর মানসিক শক্তির সংমিশ্রণ দেখিনি।” সেই মুহূর্তটি তার মনে গেঁথে গেছে।

দাকোপে লবণাক্ততা একটি বড় সমস্যা, যার ফলে পানি ও মাটি কৃষিকাজের জন্য প্রতিকূল হয়ে উঠেছে। তবুও সেখানকার মানুষ জলবায়ুর সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে টিকে আছেন। এই সফরের সুবাদে তারা জয়াকে জানাতে পেরেছেন তাদের সংগ্রামের গল্প। যেমন, কীভাবে তাদের এমন সব ফসল আর শাকসবজি খুঁজে বের করতে হয় যেগুলো জলবায়ু সহনশীল, আবার কখনও কখনও শুধু চাষাবাদের জন্যই তাদের নিজ ভূমি ছেড়ে অন্য কোনো অঞ্চলে চলে যেতে হয়।

জয়া বলেন, “আমি নিজেকে একজন কৃষক ভাবতে ভালোবাসি। কিন্তু নিজের জমিতে ফসল ফলাতে আমাকে প্রকৃতির সঙ্গে লড়তে হয় না। উপকূলের মানুষকে তা করতে হয়। এবং, তারা শিখে গেছে কীভাবে পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে জয়ী হতে হয়।” যে সামান্য জমিটুকু চাষযোগ্য থাকে, স্থানীয় লোকজন তাতেই ফসল ফলান; বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করেন; এবং প্রতিকূল জলবায়ুতে টিকে থাকার নতুন নতুন উপায় উদ্ভাবন করেন। জয়ার ভাষায়- তাদের দৃঢ় সংকল্প অভিযোজনের এক অনন্য পাঠ, আর তাদের পাশে থাকার জন্য ইউএনডিপিকে আন্তরিক ধন্যবাদ ।

এসব কঠিন বাস্তবতার বাইরেও, জয়ার হৃদয়ে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে উপকূলের মানুষের মানবতা ও বিনয়। তিনি বলেন, “এখানকার মানুষ যেভাবে সম্পর্ক, সম্পদ ও একে অপরের কদর করে, মূল্য দেয় তা সত্যিই অসাধারণ। এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি খুব শক্তিশালী, মনে হয় সকলের মিলিত জীবন সংগ্রামই সব বিভাজন মুছে দিয়েছে।” তার বিশ্বাস এই ঐক্যবোধই প্রতি বছর জোয়ারের পানি যতই বাড়ুক না কেন, উপকূলের মানুষকে এক করে রাখে।

জয়ার কাছে জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কোনো অস্পষ্ট বৈশ্বিক সংকট নয়, এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা, যা ফুটে আছে সেই মানুষগুলোর মুখে, যারা এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন। বিশ্ব যখন জলবায়ু সম্মেলন COP30 এর  জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, জয়া মনে করিয়ে দেন- এটি কেবল আরেকটি সম্মেলন নয়, বরং মানবতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তিনি বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে শিশুদের শিক্ষার প্রসার, এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি করে মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

পাশাপাশি বিশ্বনেতাদের প্রতি, কার্বন নির্গমন হ্রাস, বনভূমি রক্ষা এবং বাংলাদেশের মতো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্বি করার জন্য  বিনিয়োগ বাড়াতে আকুল আবেদন করেন । এখন আর দেরীর সুযোগ নেই। এই জলবায়ু সম্মেলনকে অবশ্যই  প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে হবে ।

সবশেষে তিনি বলেন, “এখানকার মানুষ টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কথা বলে না, তারা সেটি নিজেদের প্রাত্যহিক জীবনে যাপন করে। তাদের কাছ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে,  কিন্তু বিশ্ব যেন এখন তাদের কথা শোনে।”